শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ১১:৪৯ পূর্বাহ্ন
আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে এস আলম গ্রুপের দায়ের করা মামলায় বাংলাদেশের পক্ষে আইনি লড়াই চালাতে যুক্তরাজ্যের একটি ল ফার্ম নিয়োগ দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ল ফার্মকে ঘণ্টাপ্রতি এক হাজার ২৫০ মার্কিন ডলার ফি পরিশোধ করতে হবে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ টাকা (ডলারপ্রতি ১২২ টাকা ধরে)।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে ল ফার্ম নিয়োগ ও এ খাতে ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে দায়ের করা আইসিএসআইডি আরবিট্রেশন মামলা (কেস নম্বর: এআরবি/২৫/৫২) পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক মানের আইনি সেবা নেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রস্তাব পর্যালোচনা শেষে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি ব্রিটিশ ল ফার্ম ‘হোয়াইট অ্যান্ড কেস এলএলপি’কে নিয়োগের অনুমতি দেয়।
বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, অর্থপাচারের অভিযোগ ঘিরে এস আলম গ্রুপ আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে মামলা করেছে। বিষয়টি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস (আইসিএসআইডি)-এ গড়িয়েছে। মামলাটি জটিল ও বড় অঙ্কের আর্থিক ঝুঁকির সঙ্গে জড়িত হওয়ায় সরকারকে দক্ষ আন্তর্জাতিক আইনজীবী নিয়োগ করতে হচ্ছে।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অর্থপাচারের অভিযোগে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে সরকারের আইনগত পদক্ষেপ চলমান রয়েছে। কোনো রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে বাধা দিলে আইসিএসআইডির মাধ্যমে সালিশি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার সুযোগ থাকে। সে কারণেই সরকারকে নোটিশের জবাব দিতে হচ্ছে এবং এটি সহজ কোনো বিষয় নয়।
এর আগে গত বছরের অক্টোবরে ওয়াশিংটনভিত্তিক আইসিএসআইডিতে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ ও তার পরিবারের পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে সালিশি মামলার আবেদন দাখিল করা হয়। আবেদনে দাবি করা হয়, অবৈধ অর্থপাচারের অভিযোগে বাংলাদেশ সরকার যে সম্পদ জব্দ, বাজেয়াপ্তসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে, তাতে তাদের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
সালিশি আবেদনে আরও বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পিতভাবে তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ, সম্পদ বাজেয়াপ্ত, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে ভিত্তিহীন তদন্ত এবং নেতিবাচক গণমাধ্যম প্রচারণা চালাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তির পরিপন্থি।
এস আলম পরিবার ২০০৪ সালে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তির আওতায় এ মামলা করেছে। নথি অনুযায়ী, তারা ২০২০ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে এবং ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে। বর্তমানে তারা সিঙ্গাপুরে বসবাস করছেন।
সালিশি আবেদনে সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার দাবি করার পাশাপাশি বাংলাদেশের ১৯৮০ সালের বিদেশি ব্যক্তিগত বিনিয়োগ আইনের অধীনেও সুরক্ষা চাওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর বড় অঙ্কের অর্থপাচারের অভিযোগে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে তদন্ত এবং পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রে মোট অর্থপাচারের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার উল্লেখ করা হয়েছে। পাচার অর্থ উদ্ধারে গঠিত টাস্কফোর্সের প্রধান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দাবি করেন, এস আলম পরিবার প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করেছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এস আলম ও তার সহযোগীরা সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং ঋণ ও আমদানি জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেয়। এর ফলে কয়েকটি ব্যাংক মারাত্মক সংকটে পড়লে সরকারকে বেইলআউট দিতে হয়।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এস আলম গ্রুপের দাবি, সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগের পক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।