Dhaka ১২:০৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এক মাসের বেশি সময় ঘরবন্দি থাকার কারণ জানালেন সানিয়া

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:১৩:৫৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪১ Time View
৩৪

উচ্চচাপের পেশা—হোক তা খেলাধুলা, করপোরেট দুনিয়া, সেবামূলক কাজ বা সৃজনশীল ক্ষেত্র—প্রায়ই মানুষের জন্য দুর্বলতা, বিশ্রাম কিংবা আত্মবিশ্লেষণের জায়গা খুব কম রাখে। ফলে মানসিক চাপ নীরবে জমতে থাকে। ভারতের সাবেক টেনিস তারকা সানিয়া মির্জা এবার এই বাস্তবতার কথা খোলামেলা ভাষায় তুলে ধরেন।

দ্য লাইভ লাভ লাফ ফাউন্ডেশনের এক পডকাস্টে ফাউন্ডেশনের সিইও অনিশা পাডুকোন এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শ্যাম ভাটের সঙ্গে আলাপচারিতায় নিজের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত অভিজ্ঞতার কথা জানান সানিয়া।

তিনি বলেন, ২০০৮ সালে কবজিতে গুরুতর চোট পাওয়ার পর তার জীবনে এক কঠিন সময় নেমে আসে। সে কারণে তাকে অলিম্পিক থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল। তখন তার মনে হয়েছিল, টেনিস ক্যারিয়ার বুঝি এখানেই শেষ।

সানিয়া বলেন, আমি তখন জানতাম না যে আরও তিনটি অলিম্পিকে খেলব। কিন্তু সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল—‘হে ঈশ্বর, আমার জীবন শেষ’। আমার কবজির অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে আমি নিজের চুল পর্যন্ত আঁচড়াতে পারতাম না।

চোটের ভয়াবহতা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। কবজি নড়াচড়া করতে না পারায় তিনি ভাবতে শুরু করেন, হয়তো আর কখনো টেনিস কোর্টে ফিরতে পারবেন না।

সানিয়া বলেন, প্রথমবারের মতো আমার মনে হয়েছিল, আমি আমার বাবা-মাকে হতাশ করছি। তখন আমি বুঝতেই পারিনি এটা বিষণ্নতা। প্রায় দেড় মাস আমি শুধু নিজের ঘরেই ছিলাম। কারও সঙ্গে দেখা করতে চাইনি, এমনকি বাবা-মায়ের সঙ্গেও খুব কম দেখা হয়েছে। সময়টা ছিল ভয়ংকর।

তবে এই কঠিন সময়েও টেনিসের প্রতি ভালোবাসাই তাকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল। তিনি জানান, কয়েক মাস এই অবস্থা চলার পর তিনি বুঝতে পারেন, নিজের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে পারছেন না।

সানিয়া বলেন, যখনই মানসিক চাপ বেড়ে যেত, আমি কোর্টে চলে যেতাম। টেনিস খেললে আমি ভালো অনুভব করতাম। সত্যিকারের আনন্দ তখনই পেতাম, যখন খেলতাম।

ডা. শ্যাম ভাট এ প্রসঙ্গে বলেন, সফল মানুষের ক্ষেত্রে বিষণ্নতা অনেক সময় ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়।

তিনি বলেন, আমি এটা প্রায়ই দেখি—যারা অনেক সাফল্য অর্জন করেছেন, তাদের জীবনের আবেগগত কষ্টগুলো অনেক সময় শিল্প, খেলাধুলা বা সৃজনশীল কাজে রূপান্তরিত হয়ে যায়।

উচ্চ-কার্যক্ষম মানুষেরা কেন দেরিতে বিষণ্নতা বুঝতে পারেন

এ বিষয়ে ইন্ডিয়ানএক্সপ্রেস ডটকমকে সংগঠনগত মনোবিজ্ঞানী ও অস্তিত্ববাদী বিশ্লেষক গুরলিন বারুয়া বলেন, অনেক উচ্চ-কার্যক্ষম মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগলেও তা নিজের কাছেই অদৃশ্য থেকে যায়।

তিনি বলেন, যখন কেউ নিয়মিত ফল দিচ্ছেন, ম্যাচ জিতছেন, সময়মতো কাজ শেষ করছেন কিংবা প্রশংসা পাচ্ছেন, তখন আত্মসমীক্ষার সুযোগ খুব কম থাকে। বাইরে সব ঠিকঠাক চললে ভেতরের কষ্টকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়।

তার মতে, এটি ইচ্ছাকৃত অস্বীকার নয়; বরং কাজ করে টিকে থাকার একটি মানসিক কৌশল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীর বা আবেগ যখন গতি কমাতে বাধ্য করে, তখন বোঝা যায় সমস্যাটা অনেক গভীরে চলে গেছে।

দীর্ঘদিনের চাপ ও নিরবচ্ছিন্ন মূল্যায়নের প্রভাব

বারুয়া বলেন, খেলাধুলা মানুষকে জীবনের অনেক পাঠ শেখালেও খেলোয়াড়দের ওপর থাকে নিরবচ্ছিন্ন মূল্যায়নের চাপ—স্কোরকার্ড, র‍্যাঙ্কিং, পারফরম্যান্স, জনসমালোচনা।

তিনি বলেন, ধীরে ধীরে এমন একটি বিশ্বাস তৈরি হয় যে নিজের মূল্য মানে নিজের আউটপুট। প্রত্যাশা পূরণ না হলে মানুষ সেটাকে নিজের ব্যর্থতা হিসেবে নিতে শুরু করে।

এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগ, আত্মসংশয়, মানসিক ক্লান্তি এবং শেষ পর্যন্ত বিষণ্নতার দিকে ঠেলে দিতে পারে—বিশেষ করে যখন বিশ্রাম বা দুর্বলতা দেখানোকে অগ্রহণযোগ্য মনে করা হয়।

মানসিক চাপ আগেভাগে বুঝে সহায়তা নেওয়ার উপায়

গুরলিন বারুয়া বলেন, ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত বিরক্তি, অনুভূতিহীনতা বা সবসময় অতিভারগ্রস্ত লাগা—এসবই প্রাথমিক সংকেত। এগুলো দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান।

নিজের মূল্যকে কেবল সাফল্যের সঙ্গে না জুড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, পারফরম্যান্সের বাইরে সময় বের করা, কাউন্সেলর বা থেরাপিস্টের সঙ্গে কথা বলা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সহায়তাকে ব্যর্থতা নয়, যত্ন হিসেবে দেখাই সবচেয়ে কার্যকর।

তার মতে, সময়মতো সাহায্য চাইতে শেখা আবেগগত পরিপক্বতার পরিচয় এবং এটি মানসিক স্বাস্থ্যকে বড় বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

এক মাসের বেশি সময় ঘরবন্দি থাকার কারণ জানালেন সানিয়া

Update Time : ১০:১৩:৫৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
৩৪

উচ্চচাপের পেশা—হোক তা খেলাধুলা, করপোরেট দুনিয়া, সেবামূলক কাজ বা সৃজনশীল ক্ষেত্র—প্রায়ই মানুষের জন্য দুর্বলতা, বিশ্রাম কিংবা আত্মবিশ্লেষণের জায়গা খুব কম রাখে। ফলে মানসিক চাপ নীরবে জমতে থাকে। ভারতের সাবেক টেনিস তারকা সানিয়া মির্জা এবার এই বাস্তবতার কথা খোলামেলা ভাষায় তুলে ধরেন।

দ্য লাইভ লাভ লাফ ফাউন্ডেশনের এক পডকাস্টে ফাউন্ডেশনের সিইও অনিশা পাডুকোন এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শ্যাম ভাটের সঙ্গে আলাপচারিতায় নিজের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত অভিজ্ঞতার কথা জানান সানিয়া।

তিনি বলেন, ২০০৮ সালে কবজিতে গুরুতর চোট পাওয়ার পর তার জীবনে এক কঠিন সময় নেমে আসে। সে কারণে তাকে অলিম্পিক থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল। তখন তার মনে হয়েছিল, টেনিস ক্যারিয়ার বুঝি এখানেই শেষ।

সানিয়া বলেন, আমি তখন জানতাম না যে আরও তিনটি অলিম্পিকে খেলব। কিন্তু সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল—‘হে ঈশ্বর, আমার জীবন শেষ’। আমার কবজির অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে আমি নিজের চুল পর্যন্ত আঁচড়াতে পারতাম না।

চোটের ভয়াবহতা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। কবজি নড়াচড়া করতে না পারায় তিনি ভাবতে শুরু করেন, হয়তো আর কখনো টেনিস কোর্টে ফিরতে পারবেন না।

সানিয়া বলেন, প্রথমবারের মতো আমার মনে হয়েছিল, আমি আমার বাবা-মাকে হতাশ করছি। তখন আমি বুঝতেই পারিনি এটা বিষণ্নতা। প্রায় দেড় মাস আমি শুধু নিজের ঘরেই ছিলাম। কারও সঙ্গে দেখা করতে চাইনি, এমনকি বাবা-মায়ের সঙ্গেও খুব কম দেখা হয়েছে। সময়টা ছিল ভয়ংকর।

তবে এই কঠিন সময়েও টেনিসের প্রতি ভালোবাসাই তাকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল। তিনি জানান, কয়েক মাস এই অবস্থা চলার পর তিনি বুঝতে পারেন, নিজের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে পারছেন না।

সানিয়া বলেন, যখনই মানসিক চাপ বেড়ে যেত, আমি কোর্টে চলে যেতাম। টেনিস খেললে আমি ভালো অনুভব করতাম। সত্যিকারের আনন্দ তখনই পেতাম, যখন খেলতাম।

ডা. শ্যাম ভাট এ প্রসঙ্গে বলেন, সফল মানুষের ক্ষেত্রে বিষণ্নতা অনেক সময় ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়।

তিনি বলেন, আমি এটা প্রায়ই দেখি—যারা অনেক সাফল্য অর্জন করেছেন, তাদের জীবনের আবেগগত কষ্টগুলো অনেক সময় শিল্প, খেলাধুলা বা সৃজনশীল কাজে রূপান্তরিত হয়ে যায়।

উচ্চ-কার্যক্ষম মানুষেরা কেন দেরিতে বিষণ্নতা বুঝতে পারেন

এ বিষয়ে ইন্ডিয়ানএক্সপ্রেস ডটকমকে সংগঠনগত মনোবিজ্ঞানী ও অস্তিত্ববাদী বিশ্লেষক গুরলিন বারুয়া বলেন, অনেক উচ্চ-কার্যক্ষম মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগলেও তা নিজের কাছেই অদৃশ্য থেকে যায়।

তিনি বলেন, যখন কেউ নিয়মিত ফল দিচ্ছেন, ম্যাচ জিতছেন, সময়মতো কাজ শেষ করছেন কিংবা প্রশংসা পাচ্ছেন, তখন আত্মসমীক্ষার সুযোগ খুব কম থাকে। বাইরে সব ঠিকঠাক চললে ভেতরের কষ্টকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়।

তার মতে, এটি ইচ্ছাকৃত অস্বীকার নয়; বরং কাজ করে টিকে থাকার একটি মানসিক কৌশল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীর বা আবেগ যখন গতি কমাতে বাধ্য করে, তখন বোঝা যায় সমস্যাটা অনেক গভীরে চলে গেছে।

দীর্ঘদিনের চাপ ও নিরবচ্ছিন্ন মূল্যায়নের প্রভাব

বারুয়া বলেন, খেলাধুলা মানুষকে জীবনের অনেক পাঠ শেখালেও খেলোয়াড়দের ওপর থাকে নিরবচ্ছিন্ন মূল্যায়নের চাপ—স্কোরকার্ড, র‍্যাঙ্কিং, পারফরম্যান্স, জনসমালোচনা।

তিনি বলেন, ধীরে ধীরে এমন একটি বিশ্বাস তৈরি হয় যে নিজের মূল্য মানে নিজের আউটপুট। প্রত্যাশা পূরণ না হলে মানুষ সেটাকে নিজের ব্যর্থতা হিসেবে নিতে শুরু করে।

এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগ, আত্মসংশয়, মানসিক ক্লান্তি এবং শেষ পর্যন্ত বিষণ্নতার দিকে ঠেলে দিতে পারে—বিশেষ করে যখন বিশ্রাম বা দুর্বলতা দেখানোকে অগ্রহণযোগ্য মনে করা হয়।

মানসিক চাপ আগেভাগে বুঝে সহায়তা নেওয়ার উপায়

গুরলিন বারুয়া বলেন, ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত বিরক্তি, অনুভূতিহীনতা বা সবসময় অতিভারগ্রস্ত লাগা—এসবই প্রাথমিক সংকেত। এগুলো দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান।

নিজের মূল্যকে কেবল সাফল্যের সঙ্গে না জুড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, পারফরম্যান্সের বাইরে সময় বের করা, কাউন্সেলর বা থেরাপিস্টের সঙ্গে কথা বলা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সহায়তাকে ব্যর্থতা নয়, যত্ন হিসেবে দেখাই সবচেয়ে কার্যকর।

তার মতে, সময়মতো সাহায্য চাইতে শেখা আবেগগত পরিপক্বতার পরিচয় এবং এটি মানসিক স্বাস্থ্যকে বড় বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করে।