Dhaka ০২:৪১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস ও নতুন প্রজন্মের ভাবনা

  • থিম বিক্রয়
  • Update Time : ০৬:১০:৪৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২২ Time View
১৫

আজ ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদের এক সভায় ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে গৃহীত হয়। ১৯৫৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিনটি স্মরণে রাখতে এই দিনকে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০১৮ সাল থেকে দিনটি জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে পালিত হয়ে আসছে। সর্বস্তরের মানুষকে গ্রন্থাগারমুখী করে তোলার লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারিভাবে দিবসটি পালন করা হয়।

কোনো দিবস পালন করার উদ্দেশ্য থাকে ওই বিষয় সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে তোলা। জ্ঞানার্জন, চেতনা, মূল্যবোধের বিকাশ, গবেষণা, সংস্কৃতিচর্চা ইত্যাদির মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে গ্রন্থাগারের অপরিসীম ভূমিকা রাখার প্রত্যাশায় গ্রন্থাগার দিবসের প্রবর্তন।

গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী জেলা, উপজেলা পর্যায়ে এখন মোট গণগ্রন্থাগারের সংখ্যা ৭১টি। সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের বইয়ের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৯ হাজার। ৫৮ জেলায় মোট বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ ৩৭ হাজার। সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারে প্রতিদিন ৩ হাজার ৩৬০ জন পাঠক আসেন। অন্যদিকে জেলা পাঠাগারগুলো দৈনিক ব্যবহার করছেন প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার পাঠক।

দিবসটি উদযাপনের মাধ্যমে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি গ্রন্থাগার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান গ্রন্থাগার, এনজিও পরিচালিত গ্রন্থাগার ইত্যাদির মধ্যে একটি কার্যকর এবং ফলদায়ক সমন্বয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এরূপ সমন্বয়ের ফলে বাংলাদেশের গ্রন্থাগার সেবার মান ও কার্যকারিতা দু-ই আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে গ্রন্থাগারগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হবে। গ্রন্থাগার হচ্ছে সভ্যতার বাহন। দিবসটি ঘিরে সারা দেশের গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার অঙ্গনগুলো নানামুখী কর্মকাণ্ডে মুখর থাকে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে রাজধানী ঢাকাসহ সব জেলায় সকালে শোভাযাত্রা ও বিকেলে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, পাঠচক্র, সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়।

বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ৯০ লাখ ছাত্রছাত্রীকে বই পড়াচ্ছে। চার হাজার স্কুলে যেখানে কোনো লাইব্রেরি ছিল না, লাইব্রেরি করেছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। এছাড়া আরও দুই হাজার বিদ্যালয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র লাইব্রেরি স্থাপন করেছে। ব্র‍্যাক শিক্ষা কর্মসূচি প্রায় তিন হাজার গণকেন্দ্র ও পাঁচ হাজার কিশোর-কিশোরী ক্লাবের মাধ্যমে লাইব্রেরি কার্যক্রম পরিচালনা করে, দেশব্যাপী প্রায় ১৪ লাখ পাঠক-পাঠিকা তৈরি করেছে। এসব কেন্দ্রে বছরব্যাপী বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। জ্ঞান ও তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিল সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করছে লাইব্রেরিজ আনলিমিটেড’ কর্মসূচি। জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস ঘোষণার মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ের গ্রন্থাগার-সংক্রান্ত কার্যাবলি আরও বেগবান হচ্ছে।

গ্রন্থাগারগুলোতে পাঠকের বয়স অনুযায়ী বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি করা, চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করা ও বই পড়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করার জন্য পাঠক ফোরাম, বই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে। আগামী দিনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাতীয় গণগ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ সমগ্র দেশে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মতো জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করবে।

জ্ঞানের চর্চা, সংরক্ষণ ও মানবজাতির কল্যাণে জ্ঞান বিতরণের জন্য কালের প্রয়োজনে গড়ে উঠেছে গ্রন্থাগার। আজ আমরা যে আধুনিক গ্রন্থাগার দেখি তার ইতিহাস দুই হাজার বছরের বেশি। তবে ৪০০০-৫০০০ বছর আগেও গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব ছিল বলে ধারণা করেন গবেষকরা। মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিকে আধুনিক লাইব্রেরির অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বর্তমান আধুনিক বিশ্বের গ্রন্থাগারের সঙ্গে তুলনায় বাংলাদেশে গ্রন্থাগারগুলোকে সেই অর্থে আধুনিক বলা যায় না। বিশ্বজুড়ে লাইব্রেরির ধারণাই আজ পরিবর্তন হয়ে গেছে।

লাইব্রেরি হয়ে উঠেছে একাধারে জ্ঞান বিতরণকেন্দ্র, সামাজিক মিলনমেলার স্থান, একই সঙ্গে বিনোদনকেন্দ্রও বলা যায়। একসময় গ্রন্থাগার ছিল আবদ্ধ, সাধারণ মানুষের জন্য তা উন্মুক্ত ছিল না। গণতন্ত্রের প্রসারে জ্ঞানবিজ্ঞানে জনসাধারণের প্রবেশের পাশাপাশি ওই সব রাজরাজড়াদের লাইব্রেরিও উন্মুক্ত হয়েছে সাধারণ মানুষের জন্য। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে গবেষক, সাধারণ মানুষ সবার জ্ঞানের পিপাসা মেটানোর জন্য গ্রন্থাগার সেবা প্রদান করে যায়।

রাষ্ট্রের উন্নয়নে গ্রন্থাগারের ভূমিকা অনুমান করার জন্য তথ্যবিহীন একটি রাষ্ট্র কল্পনা করা যায়, যেখানে কোনো তথ্য লিপিবদ্ধ নেই, না আছে আগের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কোনো নথিপত্র। এমন একটি রাষ্ট্র বর্তমান বিশ্বে যদি টিকে থাকা সম্ভব না হয় তাহলে লাইব্রেরির উন্নয়ন ছাড়াও কেন রাষ্ট্রের উন্নয়ন হতে পারে না এই ধারণাটুকু আমরা পেতে পারি। গ্রন্থাগার শুধু বই ধারণ করে এমন নয়, একটি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, অর্জন, আবিষ্কার-সবই ধারণ করে। অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সেতুবন্ধন তৈরি করে। গ্রন্থাগারের উন্নয়নে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ দেওয়া এবং গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের উপযুক্ত মূল্যায়ন করা সরকারের কর্তব্য।

আমাদের সমাজে গ্রন্থাগার বলতে এখনো সেই আলমারিতে সাজানো সারি সারি বইয়ের চিত্রই মানসপটে ভেসে ওঠে। কিন্তু প্রযুক্তির ছোঁয়ায় গ্রন্থাগারের ধারণা পরিবর্তিত হয়ে ডিজিটাল গ্রন্থাগার হয়ে গেছে বেশ আগেই। গ্রন্থাগারে ডিজিটাল তথ্যসামগ্রী সংরক্ষণ ও সরবরাহ করা হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে আছে ই-বুক, পিডিএফ, সিডি, ডিভিডি, ইন্টারনেট পরিষেবা, অনলাইন গবেষণা জার্নাল, অনলাইন ডকুমেন্টেশনসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সেবা। পাঠক চাইলে খুব সহজে গ্রন্থাগারের সব ডিজিটাইজড ভার্সন অ্যাকসেস পেয়ে ঘরে বসেই পড়াশোনা করতে পারছে। সময়, শ্রম, অর্থসাশ্রয়ী এই পদ্ধতি প্রয়োগে দরকার ডিজিটাল অবকাঠামো ও দক্ষ জনশক্তি। পর্যাপ্ত অর্থ বিনিয়োগে সরকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও দক্ষ জনশক্তি নিয়োগের মাধ্যমে গ্রন্থাগারগুলো ডিজিটাল গ্রন্থাগারে পরিণত করতে পারে। শুধু সারি সারি বইয়ের ধারণা থেকে বের হয়ে গ্রন্থাগারকে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন কর যেতে পারে।

গ্রন্থাগার দিবসের আবেদন হলো গ্রন্থাগারের বার্তা সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া; সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রন্থাগারের সেবা পৌঁছে দেওয়া। তথ্যসমৃদ্ধ জনগণ রাষ্ট্রের জন্য সম্পদ, তাই তথ্য পৌঁছে দিতে গ্রন্থাগারকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা রাষ্ট্রের কর্তব্য। আলোকিত ও সত্যিকার শিক্ষিত সচেতন দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে কাজ করছে। জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালন সফল হোক। আধুনিক তথ্যনির্ভর জাতি গঠনে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পাঠাগার সেবা সবার কাছে পৌঁছে যাক।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস ও নতুন প্রজন্মের ভাবনা

Update Time : ০৬:১০:৪৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
১৫

আজ ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদের এক সভায় ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে গৃহীত হয়। ১৯৫৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিনটি স্মরণে রাখতে এই দিনকে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০১৮ সাল থেকে দিনটি জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে পালিত হয়ে আসছে। সর্বস্তরের মানুষকে গ্রন্থাগারমুখী করে তোলার লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারিভাবে দিবসটি পালন করা হয়।

কোনো দিবস পালন করার উদ্দেশ্য থাকে ওই বিষয় সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে তোলা। জ্ঞানার্জন, চেতনা, মূল্যবোধের বিকাশ, গবেষণা, সংস্কৃতিচর্চা ইত্যাদির মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে গ্রন্থাগারের অপরিসীম ভূমিকা রাখার প্রত্যাশায় গ্রন্থাগার দিবসের প্রবর্তন।

গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী জেলা, উপজেলা পর্যায়ে এখন মোট গণগ্রন্থাগারের সংখ্যা ৭১টি। সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের বইয়ের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৯ হাজার। ৫৮ জেলায় মোট বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ ৩৭ হাজার। সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারে প্রতিদিন ৩ হাজার ৩৬০ জন পাঠক আসেন। অন্যদিকে জেলা পাঠাগারগুলো দৈনিক ব্যবহার করছেন প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার পাঠক।

দিবসটি উদযাপনের মাধ্যমে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি গ্রন্থাগার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান গ্রন্থাগার, এনজিও পরিচালিত গ্রন্থাগার ইত্যাদির মধ্যে একটি কার্যকর এবং ফলদায়ক সমন্বয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এরূপ সমন্বয়ের ফলে বাংলাদেশের গ্রন্থাগার সেবার মান ও কার্যকারিতা দু-ই আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে গ্রন্থাগারগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হবে। গ্রন্থাগার হচ্ছে সভ্যতার বাহন। দিবসটি ঘিরে সারা দেশের গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার অঙ্গনগুলো নানামুখী কর্মকাণ্ডে মুখর থাকে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে রাজধানী ঢাকাসহ সব জেলায় সকালে শোভাযাত্রা ও বিকেলে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, পাঠচক্র, সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়।

বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ৯০ লাখ ছাত্রছাত্রীকে বই পড়াচ্ছে। চার হাজার স্কুলে যেখানে কোনো লাইব্রেরি ছিল না, লাইব্রেরি করেছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। এছাড়া আরও দুই হাজার বিদ্যালয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র লাইব্রেরি স্থাপন করেছে। ব্র‍্যাক শিক্ষা কর্মসূচি প্রায় তিন হাজার গণকেন্দ্র ও পাঁচ হাজার কিশোর-কিশোরী ক্লাবের মাধ্যমে লাইব্রেরি কার্যক্রম পরিচালনা করে, দেশব্যাপী প্রায় ১৪ লাখ পাঠক-পাঠিকা তৈরি করেছে। এসব কেন্দ্রে বছরব্যাপী বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। জ্ঞান ও তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিল সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করছে লাইব্রেরিজ আনলিমিটেড’ কর্মসূচি। জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস ঘোষণার মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ের গ্রন্থাগার-সংক্রান্ত কার্যাবলি আরও বেগবান হচ্ছে।

গ্রন্থাগারগুলোতে পাঠকের বয়স অনুযায়ী বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি করা, চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করা ও বই পড়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করার জন্য পাঠক ফোরাম, বই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে। আগামী দিনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাতীয় গণগ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ সমগ্র দেশে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মতো জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করবে।

জ্ঞানের চর্চা, সংরক্ষণ ও মানবজাতির কল্যাণে জ্ঞান বিতরণের জন্য কালের প্রয়োজনে গড়ে উঠেছে গ্রন্থাগার। আজ আমরা যে আধুনিক গ্রন্থাগার দেখি তার ইতিহাস দুই হাজার বছরের বেশি। তবে ৪০০০-৫০০০ বছর আগেও গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব ছিল বলে ধারণা করেন গবেষকরা। মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিকে আধুনিক লাইব্রেরির অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বর্তমান আধুনিক বিশ্বের গ্রন্থাগারের সঙ্গে তুলনায় বাংলাদেশে গ্রন্থাগারগুলোকে সেই অর্থে আধুনিক বলা যায় না। বিশ্বজুড়ে লাইব্রেরির ধারণাই আজ পরিবর্তন হয়ে গেছে।

লাইব্রেরি হয়ে উঠেছে একাধারে জ্ঞান বিতরণকেন্দ্র, সামাজিক মিলনমেলার স্থান, একই সঙ্গে বিনোদনকেন্দ্রও বলা যায়। একসময় গ্রন্থাগার ছিল আবদ্ধ, সাধারণ মানুষের জন্য তা উন্মুক্ত ছিল না। গণতন্ত্রের প্রসারে জ্ঞানবিজ্ঞানে জনসাধারণের প্রবেশের পাশাপাশি ওই সব রাজরাজড়াদের লাইব্রেরিও উন্মুক্ত হয়েছে সাধারণ মানুষের জন্য। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে গবেষক, সাধারণ মানুষ সবার জ্ঞানের পিপাসা মেটানোর জন্য গ্রন্থাগার সেবা প্রদান করে যায়।

রাষ্ট্রের উন্নয়নে গ্রন্থাগারের ভূমিকা অনুমান করার জন্য তথ্যবিহীন একটি রাষ্ট্র কল্পনা করা যায়, যেখানে কোনো তথ্য লিপিবদ্ধ নেই, না আছে আগের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কোনো নথিপত্র। এমন একটি রাষ্ট্র বর্তমান বিশ্বে যদি টিকে থাকা সম্ভব না হয় তাহলে লাইব্রেরির উন্নয়ন ছাড়াও কেন রাষ্ট্রের উন্নয়ন হতে পারে না এই ধারণাটুকু আমরা পেতে পারি। গ্রন্থাগার শুধু বই ধারণ করে এমন নয়, একটি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, অর্জন, আবিষ্কার-সবই ধারণ করে। অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সেতুবন্ধন তৈরি করে। গ্রন্থাগারের উন্নয়নে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ দেওয়া এবং গ্রন্থাগার পেশাজীবীদের উপযুক্ত মূল্যায়ন করা সরকারের কর্তব্য।

আমাদের সমাজে গ্রন্থাগার বলতে এখনো সেই আলমারিতে সাজানো সারি সারি বইয়ের চিত্রই মানসপটে ভেসে ওঠে। কিন্তু প্রযুক্তির ছোঁয়ায় গ্রন্থাগারের ধারণা পরিবর্তিত হয়ে ডিজিটাল গ্রন্থাগার হয়ে গেছে বেশ আগেই। গ্রন্থাগারে ডিজিটাল তথ্যসামগ্রী সংরক্ষণ ও সরবরাহ করা হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে আছে ই-বুক, পিডিএফ, সিডি, ডিভিডি, ইন্টারনেট পরিষেবা, অনলাইন গবেষণা জার্নাল, অনলাইন ডকুমেন্টেশনসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সেবা। পাঠক চাইলে খুব সহজে গ্রন্থাগারের সব ডিজিটাইজড ভার্সন অ্যাকসেস পেয়ে ঘরে বসেই পড়াশোনা করতে পারছে। সময়, শ্রম, অর্থসাশ্রয়ী এই পদ্ধতি প্রয়োগে দরকার ডিজিটাল অবকাঠামো ও দক্ষ জনশক্তি। পর্যাপ্ত অর্থ বিনিয়োগে সরকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও দক্ষ জনশক্তি নিয়োগের মাধ্যমে গ্রন্থাগারগুলো ডিজিটাল গ্রন্থাগারে পরিণত করতে পারে। শুধু সারি সারি বইয়ের ধারণা থেকে বের হয়ে গ্রন্থাগারকে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন কর যেতে পারে।

গ্রন্থাগার দিবসের আবেদন হলো গ্রন্থাগারের বার্তা সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া; সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রন্থাগারের সেবা পৌঁছে দেওয়া। তথ্যসমৃদ্ধ জনগণ রাষ্ট্রের জন্য সম্পদ, তাই তথ্য পৌঁছে দিতে গ্রন্থাগারকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা রাষ্ট্রের কর্তব্য। আলোকিত ও সত্যিকার শিক্ষিত সচেতন দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে কাজ করছে। জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালন সফল হোক। আধুনিক তথ্যনির্ভর জাতি গঠনে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পাঠাগার সেবা সবার কাছে পৌঁছে যাক।